মঙ্গলবার, ০৫ মে ২০২৬, ১২:৪১ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
আলফাডাঙ্গা সরকারি ডিগ্রি কলেজে তিন প্রভাষকের অশ্রুসিক্ত বর্ণিল বিদায় টেকনাফ প্রেসক্লাবের উদ্যোগে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস পালিত টেকনাফ উপজেলা বিএনপির বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত সকলের কাছে দোয়া চেয়েছেন হাফেজ মোহাম্মদ সালমান প্রকাশিত সংবাদের একাংশের প্রতিবাদ ও ব্যাখ্যা হজ ফ্লাইট শুরু, উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী সেন্টমার্টিনে বিদেশি মদ ও গাঁজাসহ ১০ পাচারকারী আটক বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উপলক্ষে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানালেন রুহুল আমিন মিলন হত্যাচেষ্টা মামলায় সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিনের জামিন মানবিক নেতৃত্বের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত: অসুস্থ সাংবাদিকের শয্যাপাশে এমপি ড. ইলিয়াস মোল্যা

আলফাডাঙ্গা সরকারি ডিগ্রি কলেজে তিন প্রভাষকের অশ্রুসিক্ত বর্ণিল বিদায়

কবির হোসেন, আলফাডাঙ্গা (ফরিদপুর) প্রতিনিধি / ১৭৬ বার পড়া হয়েছে
আপডেট সময় : সোমবার, ৪ মে, ২০২৬

সময়ের স্রোতে ভেসে যায় কত মুখ, কত নাম। কিন্তু কিছু মানুষ রেখে যান এমন কিছু পদচিহ্ন, যা কালের ধুলো মুছে দিতে পারে না। তেমনই এক অশ্রুসিক্ত, অথচ গৌরবের দিনের সাক্ষী হলো আলফাডাঙ্গা সরকারি ডিগ্রি কলেজ।

আবেগ, ভালোবাসা ও গভীর শ্রদ্ধার অপূর্ব মেলবন্ধনে দৃষ্টিনন্দন ও হৃদয়স্পর্শী আয়োজনে এ কলেজ থেকে বিদায় জানানো হলো হিসাববিজ্ঞান, রসায়ন ও ভূগোল বিভাগের তিনজন প্রজ্ঞাবান প্রভাষক মোঃ মহসিন মিয়া, মোঃ শামসুজ্জামান মিনা ও বিভূতি ভূষণ বিশ্বাসকে। যেন জ্ঞানের তিনটি বাতিঘর আজ নিভে গেল আনুষ্ঠানিকভাবে, কিন্তু রেখে গেল সহস্র প্রদীপ জ্বালানোর অঙ্গীকার।

সোমবার( ৪ মে) দিনব্যাপী কলেজ অডিটোরিয়াম যেন পরিণত হয়েছিল এক স্মৃতির রাজপ্রাসাদে। দেওয়ালে দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল তিন যুগের ইতিহাস, বাতাসে ভাসছিল চাপা দীর্ঘশ্বাস। শিক্ষক পরিষদের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ বিদায় সংবর্ধনায় কলেজের শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি প্রমাণ করে বিদায় বেদনার হলেও সম্মান আর ভালোবাসা কখনো পুরনো হয় না।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কলেজের অভিভাবকতুল্য অধ্যক্ষ মোঃ আব্দুস সালাম এবং সভাপতিত্ব করেন শিক্ষক পরিষদের সম্পাদক প্রবীর কুমার বিশ্বাস। তাঁদের স্নেহমাখা উপস্থিতি আয়োজনকে দিয়েছিল পিতৃসুলভ ছায়া, এনে দিয়েছিল অনন্য মর্যাদা ও গাম্ভীর্য।

প্রধান অতিথি মোঃ আব্দুস সালাম তাঁর মেঘমন্দ্র অথচ মমতাময় কণ্ঠে বলেন, “শিক্ষকতা পেশা নয়, এক মহিমান্বিত সাধনা। আজ যাঁরা কর্মজীবনের ইতি টানছেন, তাঁরা তাঁদের যৌবনের সোনালি সময় ঢেলে দিয়েছেন এই প্রতিষ্ঠানের ভিত গড়তে। নিষ্ঠা, প্রজ্ঞা ও মমতার আলোয় তাঁরা আলোকিত করেছেন অসংখ্য প্রাণ। সে ঋণ শোধ করার নয়, শুধু হৃদয়ে ধারণ করার।

কণ্ঠ ভারী করে তিনি আরও বলেন, নদী যেমন সাগরে মেশে, শিক্ষকও তেমনি অবসরে মেশেন সমাজের বৃহত্তর পাঠশালায়। এই বিদায় সাময়িক বিচ্ছেদ মাত্র। তাঁদের রেখে যাওয়া আদর্শ, মূল্যবোধ ও স্মৃতি আমাদের মাঝে চিরজাগরুক থাকবে। বিশ্বাস করুন, আপনারা চলে যাচ্ছেন না— রয়ে যাচ্ছেন এই কলেজের প্রতিটি ইট, প্রতিটি ধূলিকণায়, প্রতিটি সবুজ ঘাসে।

অনুষ্ঠানের সভাপতি প্রবীর কুমার বিশ্বাস স্মৃতির সাগরে ডুব দিয়ে বলেন, সহযোদ্ধার বিদায় বড় বেদনার। কাল থেকে স্টাফ রুমের যে চেয়ারগুলো খালি পড়ে থাকবে, সেখানে জমে থাকবে তিন দশকের হাসি-কান্না, তর্ক-বিতর্ক, চা-এর কাপে জমে থাকা স্বপ্ন। পরীক্ষার খাতা দেখার নিঃশব্দ রাত, নবীনবরণের কোলাহল— সবখানে হাহাকার করে উঠবে আপনাদের শূন্যতা। আপনারা ছিলেন আমাদের পথচলার বাতিঘর, আপনারাই আমাদের সাহস।

শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার ফুল ঝরিয়ে বক্তব্য রাখেন সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান বিষ্ণু পদ মন্ডল, ইসলামের ইতিহাস বিভাগের বিভাগীয় প্রধান আ. রশিদ খান, শিক্ষক পরিষদের সহ-সম্পাদক ও প্রভাষক মোঃ মোরাদ হোসেন তালুকদার, কোষাধ্যক্ষ জেনারুল ইসলাম এবং সদস্য মোঃ মুকুল প্রমুখ।

বক্তাদের কণ্ঠে একই সুর বাজে, বিদায়ী শিক্ষকরা শুধু পাঠদান করেননি, জীবন গড়ে দিয়েছেন। তাঁরা ছিলেন অন্ধকারে আলোর দিশারি, হতাশার মাঝে প্রেরণার বাতিঘর। তাঁদের প্রতিটি ক্লাস ছিল একেকটি জীবনবোধের কবিতা। তাঁদের পদচারণায় এই ক্যাম্পাস পেয়েছে প্রাণ, পেয়েছে প্রজ্ঞার আলো।

এরপর সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। বিদায়ী শিক্ষকরা যখন মাইক্রোফোন হাতে নিলেন, তখন গোটা অডিটোরিয়াম নিঃশব্দ। শুধু শোনা যাচ্ছিল হৃদয়ের স্পন্দন।

হিসাববিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মোঃ মহসিন মিয়া কাঁপা কণ্ঠে বলেন, এই কলেজ আমার রক্তে মিশে আছে। এর সঙ্গে আমার নাড়ির সম্পর্ক। এখানকার প্রতিটি দেয়াল, প্রতিটি বেঞ্চ আমার চেনা। এখানে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত আমার হৃদয়ের মণিকোঠায় অমলিন হয়ে থাকবে।

রসায়ন বিভাগের প্রভাষক মোঃ শামসুজ্জামান মিনা অশ্রুসজল চোখে বলেন, এতগুলো বছর ধরে যে সহকর্মীদের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছি, আজ সেই ভালোবাসাই আমাকে কাঁদাচ্ছে। বিদায় শব্দটা বড় নির্মম। এই মুহূর্ত বেদনাবিধুর হলেও আপনাদের দেওয়া সম্মান আর স্মৃতিগুলো আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন।

ভূগোল বিভাগের প্রভাষক বিভূতি ভূষণ বিশ্বাস আবেগরুদ্ধ কণ্ঠে বলেন, আমি কিছুই ছিলাম না। এই কলেজ আমাকে পরিচয় দিয়েছে, মানুষ হিসেবে মর্যাদা দিয়েছে, শিক্ষক হিসেবে সম্মান দিয়েছে। এই ঋণ আমি কোনোদিন শোধ করতে পারব না। আমি সবার কাছে চিরকৃতজ্ঞ, চিরঋণী।

পুরো অনুষ্ঠানটি কবিতার মতো প্রাঞ্জল ভাষা ও সাবলীল উপস্থাপনায় মালার সুতোয় গেঁথেছেন অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক মোঃ মাহিদুল হক। তাঁর সঞ্চালনায় বিষাদের মাঝেও ছিল এক অদ্ভুত শৃঙ্খলা, এক পরম প্রশান্তি।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে ভালোবাসার শেষ আয়োজন। ফুলেল শুভেচ্ছা, সম্মাননা স্মারক আর প্রিয় সহকর্মীদের উষ্ণ আলিঙ্গনে সিক্ত হলেন তিন গুণী শিক্ষক। কারো চোখের কোণে জল, কারো ঠোঁটে মলিন হাসি— এই হলো বিদায়ের অলিখিত কাব্য।

পুরো আয়োজনজুড়ে ছিল এক স্বর্গীয় আবহ। মনে হচ্ছিল, সময় যেন থমকে গেছে। আবেগের ঢেউ আছড়ে পড়ছিল প্রতিটি হৃদয়ের তীরে। এ বিদায় শুধু চাকরি জীবনের সমাপ্তি নয়, এ এক যুগের অবসান। এ বিদায় কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, এ হলো স্মৃতির পাতায় অশ্রুজলে লেখা এক মহাকাব্য, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে উচ্চারিত হবে শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এজাতীয় আরো সংবাদ
Developed By AZAD WEB IT